জলের গহীন স্বরে অথবা ব্যস্ত সন্ধ্যার সাথে

জলের গহীন স্বরে অথবা ব্যস্ত সন্ধ্যার সাথে

সৈয়দ সাখাওয়াৎ

যেদিন শব্দেরা পথ থমকে দাঁড়িয়ে ওই মুখে
দ্যাখেছে চোখের রঙ, বুকে পুষে স্বপ্নের মাদুলি
দূর কোন জানালায় রোদ ছুঁয়ে যায় কিংশুকে
সেদিন কি জানবে না তুমি–হৃদয় বলেছিল কী?

আমার ধর্ম মানিনি–যেনবা খুঁজে গ্যাছি তোমাকে
জলের গহীন স্বরে অথবা ব্যস্ত সন্ধ্যার সাথে
ফেরা হবে না কোথাও, মর্মরে–অস্থির এক বাঁকে–
দাঁড়িয়ে আছি–তোমার ওই হাত স্পর্শে ফিরে পেতে।

তাই সেইসব দিন খুব হৃদয়ের কাছাকাছি
যখন অস্বস্তি ছেড়ে তোমাকে চোখের কাছে পাই
সরল মুখের দিকে চেয়ে দ্যাখি যেন সমগ্র ধী
অমল প্রশান্তি নেমে আসে শুধু চোখের দেখাই।

২.
তুমি মানে এ’জীবন– খুঁড়ে দ্যাখা সীমানা অবধি
ক্রমে আলাদা হওয়া, শেষ বেলায় কত আকুতি
ঝরে যায় হাওয়ার সাথে, বিস্ময়ে ও বেদনায়
অথচ জানি এটাই হবার কথা, এ’ দোটানায়
এরচেয়ে বেশিকিছু ছিলো না–দেওয়ার মতন
শুধু এক বিকেলের অনাগত ঘ্রাণ– বিসর্জন
এক হয়ে ছুটে আসে আর তুমি চলে যাও দূরে–
আঙুলের স্পর্শ থেকে–কেবলই চলে যাও সরে…

৩.
যতবার তোমাকে দ্যাখি, হৃদয় নেচে ওঠে
যত কথা বলি, সে-তো তোমার দিকেই ছুটে
অস্ফুট স্বরে অথবা প্রগাঢ় লীন অহঙ্কারে
বেদনা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দ্যাখি–চাইনি অধিকারে

শুধু চেয়েছি– ভোর হলে তোমার ঘুমচোখে
আমাকে মনে করো, ভুলে বিষাদের রাত্রিকে
অথবা কাজের ফাঁকে, মনে করে খবরটুকু নিও
দূরবর্তী হাওয়ায় আমাকে খুঁজে নেবে প্রিয়

আর কীইবা চাইতে পারি এই চির অবেলায়
তোমাতে পৌঁছাতে চাই তবু ভীষণ পাওয়ায়
যেন সূর্যের মতন তোমাকে করি পরিক্রমা
তুমি কি শুনেছো গান? পেরিয়ে রাত্রির অমা?

এই যে সকাল ফোটে–আমি লিখে যাই যতো
সে- তো তোমারই অনুভবে, তোমাকে পাবার মতো
আমার দু’চোখে তবু ভেসে আসে লু হাওয়া
অপেক্ষায় কাটে দিন, তোমার কাছে যাওয়া…

৪.
যেভাবে অন্ধ লোকটি ভুল করে
আরেকবার দেখতে চেয়ে আরক্ত চোখদুটো
তুলে নেয় হাতে–
সেভাবে ভুল করে বসি,
আমার অন্ধ চোখজোড়া
কেবল তোমাকে দেখার জন্য
কেমন নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে
বিস্মরণের স্মৃতি নেই কোনোখানে…

৫.
এমনও সন্ধ্যা আসে–
তুমি চলে যাও রাস্তার বাতিগুলো পেছনে ফেলে
আর ধূলো ওড়া পথের দিকে তাকিয়ে ভাবি–
হঠাৎ একটা জীবন পালটে যায় আর হাতের মুঠোয়
স্মৃতিগুলো থমকে দাঁড়ায়
তখন, তুমি যেন গেয়ে ওঠো কোনো সূবর্ণ সঙ্গীত
বুকের গভীরে তখন নদী..

সেইসব সন্ধ্যায়;
বাউল বাতাস এসে ডেকে ওঠে
হৃদয় রঙিন হয়ে ওঠে আর ভাবি–
যেন বারবার সেই সন্ধ্যায় গিয়ে বসতে পারি মুখোমুখি
আর সমগ্র অন্ধকার ক্রমশ আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে…

৬.
চোখভরা আজ অলস সকাল, বুকের গহীন এপার-ওপার
কতটা ভার বয়েছিলো একটা জীবন নির্জনতার
কেউ কি জানে? কোন দুচোখে, চোখ ডুবে যায় সন্ধ্যেবেলা
মাঝরাত্তিরে ব্রোকেন স্লিপে শূন্যহাতের গল্প বলা?
মন যমুনায় রাধার অরূপ বিষাদ ছুঁয়ে মনে পড়ে
এক বিকেলের গল্পগুলো আগুন হয়ে কেন ঝরে?
রহস্য এক বুকের ভেতর ক্রমে ক্রমে বাড়ছে দ্যাখো–
দুই দিগন্তে স্মৃতির শহর ঘর আর বাহির মিলায় সাঁকো
জানি অনেক জটিল ভাবনা, মনের ভেতর প্রশ্ন আসে
তবুও জেনো হৃদয় বাঁচে না পাওয়ার-ই দীর্ঘশ্বাসে…

৭.
যে বলেছিলো বোধনের কথা, ক্রমে বাড়ে হৃদয়ের যথার্থতা
তার কাছে জমে ওঠে ঋণ–কী করে ভাঙবো এই প্রাতিষ্ঠানিকতা
এই হাত ছুঁয়ে তবে যেতে চাই বন্ধুর মতো দূরপথে আরও
হৃদয়ে পলাশ ফোটে– পথে যেতে যেতে ডেকে নিও আবারও
এমন হাওয়ায় পাবো কি তোমার দেখা, জীবনের বাঁকে?
তিমির হননের দিনে নারী, খুঁজে খুঁজে পাগল করবো তোমাকে…
৮.
কখনো তোমার স্মৃতি, সুগন্ধ মাখা চেনা বালিশে
ফিরে আসে–যেন আছো, পাশ ফিরলেই চোখে ভাসে
অথচ তুমি যে নেই– থমকে আছি দুপুর রাতে–
তোমার গন্ধ মেখেছি, ঈশ্বরের মতো দুই হাতে
শব্দহীনতার কালে, এই কথা ফিরে ফিরে আসে
যেনবা ফিরে যাওয়া, ঘর পালানো সেই পঁচিশে
এখনো প্রেমের নামে জেগে উঠি আধ শতাব্দীতে
এভাবেই বেঁচে আছি তোমার ভাবনায়–সঙ্গীতে…

৯.
এ’শহরে তবু সন্ধ্যা নামলো বলে
সুযোগ মিললে তোমার কাছে যাওয়া
আর কোনদিন অদেখায় চলে গেলে
বুকে বিষাদের বয়ে যায় চির হাওয়া

তোমাকে দ্যাখেছি ফিরে যাওয়া শেষ রোদে
মাটির কাছে, প্রাচীন ছায়ার পাশে
অথবা ঘন নিশ্বাস নেওয়া বোধে
তোমাকে চেয়েছি লোকায়ত সর্বনাশে

ছিলাম কখনো পরিচিত রোদ মেখে
তোমার আঙুলে ফুটেছে বহুল স্বর
সময়ের কাছে প্রশ্ন রেখে রেখে
ঘুরে ঘুরে মরা এ’শহর ও’শহর

কাছে থাকা দিন সময় ফুরিয়ে যায়
নিমিষে সকাল ফুরায় সন্ধ্যেবেলায়
বেলা শেষে দ্যাখি চিরচেনা অপেক্ষায়
মুখ দ্যাখা শুধু ব্যথাতুর আয়নায়

১০.
এমন অনেক দিন কাটে না রাত কাটে না, একলা লাগে
জানি তোমায় এ’কথাটি বলতে অনেক দ্বিধা
আমার না হয় একটা জীবন কাটলো কেবল একাই জেগে
তুমি শুধু মধ্যযামের ব্যর্থ হাওয়া থামিয়ে দিয়ে– ভালো থেকো
দুঃখ ভুলে, আপন প্রেমের আঙুল ছুঁয়ে সুখেই থেকো
মগ্ন কোনো শীতের রাতে পড়লে মনে
জানিও কেবল, তাতেই হবে–
ভুল জীবনের আর্তনাদে, আমার সকাল অন্ধ হলে তোমার স্মৃতির ডাক পাঠাবো, মনে রেখো…

সৈয়দ সাখাওয়াৎ
Written by
সৈয়দ সাখাওয়াৎ
Join the discussion

সৈয়দ সাখাওয়াৎ
সৈয়দ সাখাওয়াৎ

সৈয়দ সাখাওয়াৎ

জন্ম ৮ আগস্ট ১৯৭৮; চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর।